প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সৌদি আরব ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন তথ্য জানিয়েছেন আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, লোহিত সাগরের নৌপথের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সৌদি আরব উপকূলীয় অভিযান এবং একাধিক দিক থেকে হামলার পরিকল্পনা করছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযানের প্রস্তুতির বিষয়ে অবগত ছয়জনের সূত্রে জানা গেছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই অভিযান শুরু হতে পারে। ইয়েমেনি স্থলবাহিনী, যা সৌদি আরবের তত্ত্বাবধানে রয়েছে, এই অভিযানে প্রধান ভূমিকা পালন করবে। তাদের সহায়তায় সৌদি বিমানবাহিনী হামলা চালাতে পারে। তবে সৌদি আরব এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযানের ঘোষণা দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে সহায়তার জন্য গোয়েন্দা তথ্য প্রদান করছে। পাশাপাশি, কিছু আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশ সৌদি আরবকে মূলত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরবের মিত্র দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না।
২০১৫ সালে সৌদি আরব ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সমর্থনে একটি আরব জোটের নেতৃত্ব দেয়। ইরান-সমর্থিত হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে ওই সরকারকে সরিয়ে দিয়েছিল। ২০২২ সালে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পন্ন হয়। এরপর বেশিরভাগ সময় পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল। তবে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হুতিরা সৌদি আরবের জাহাজ চলাচল ও তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরব হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা জানান, হুতিরা উপকূলীয় এলাকায় এগিয়ে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে।
সৌদি আরব দুটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছে, একটি হলো বাব আল-মানদেব এলাকায় সীমিত হামলা এবং অন্যটি হলো ইয়েমেনের কয়েকটি এলাকায় একযোগে বড় অভিযান। যদি অভিযান বড় হয়, তাহলে এতে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা অংশ নিতে পারে, এমন তথ্য জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তবে সৌদি আরব, ইয়েমেন, হুতি ও যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
বাব আল-মানদেব হলো লোহিত সাগরের দক্ষিণের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এটি ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ। হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এই পথের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমা কূটনীতিক ও উপসাগরীয় কর্মকর্তারা বলছেন, হুতিদের নিয়ন্ত্রণে বাব আল-মানদেব থাকলে সৌদি আরব নতুন শান্তি আলোচনায় যেতে চায় না।
রিয়াদ মনে করছে, এতে হুতিরা বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা পাবে। তবে সৌদি অভিযান কবে শুরু হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সংশ্লিষ্ট ছয়জনের ধারণা, এক সপ্তাহের মধ্যে অথবা নভেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর অভিযান শুরু হতে পারে।
সৌদি আরবে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি মনে করেন, অভিযানটি নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে সীমিত পরিসরে হতে পারে। ২০১৫ সালের সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের তুলনায় এর পরিধি ছোট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
তিনি আরও বলেন, হুতিদের পুরোপুরি দুর্বল করা এবং বাব আল-মানদেবের উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখল করাও সৌদি আরবের লক্ষ্য হতে পারে। এতে নৌপথে স্বাভাবিক চলাচল ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তার মতে, এ ধরনের অভিযান তুলনামূলকভাবে সীমিত পরিসরে হতে পারে। গত তিন বছরে লেবাননের হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়ার পর হুতিরা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অন্যতম শক্তিশালী মিত্রে পরিণত হয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরো বেড়ে গেছে। এর মধ্যে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন নতুন অভিযান শুরু হলে অঞ্চলটিতে আরেকটি বড় সংঘাতের কেন্দ্র তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্প, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সহায়তা
সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে সৌদি অভিযানে গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছে। তবে সরাসরি বিমান হামলায় সহায়তা করার সৌদি অনুরোধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকচ করেছেন বলে জানা গেছে। তুরস্ক ও পাকিস্তানও সৌদি আরবকে সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করছে। পাকিস্তান ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সরকারের ঘাঁটি এডেনে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধের সরঞ্জাম পাঠিয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারাও সৌদি বাহিনীকে সহায়তা করছেন বলে জানা গেছে। তবে পাকিস্তান ইয়েমেনে যুদ্ধ করার জন্য কোনো সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা। এ কারণে রিয়াদ কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়েছে।
এদিকে ফ্রান্সও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী ইয়ানবু রক্ষায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
বিভক্ত ইয়েমেনি বাহিনী, সৌদির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ইয়েমেনে সৌদি আরবের স্থল অভিযান অনেকটাই নির্ভর করবে হুতিবিরোধী বিভিন্ন ইয়েমেনি বাহিনীর ওপর। এসব বাহিনীকে আগে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। তবে হুতিবিরোধী বাহিনীগুলো এখনো পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ নয়।
ইয়েমেন বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশা বলেন, হুতিদের মোকাবিলায় বড় ধরনের অভিযান চালানোর মতো প্রস্তুতি অনেক বাহিনীর এখনো নেই। এর মধ্যে হুতিরা একাধিক এলাকায় চাপ তৈরি করছে। গত শীতেও ইয়েমেনি বাহিনীর মধ্যে বিভক্তি আরও বেড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় যোদ্ধারা নতুন এলাকা দখলের চেষ্টা করলে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। পরে তারা পরাজিত হয়।
সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবির মতে, হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান সফল হবে কি না, তা মূলত ইয়েমেনি স্থলবাহিনীর সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। এতদিন তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল নিজেদের অবস্থান রক্ষা করা; এখন তাদের আক্রমণাত্মক অভিযানে যেতে হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন