প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ফেনী, ৩০ আগস্ট, ২০২৬ : বিষধর সাপ উদ্ধার করে অবমুক্ত করাই নেশা ও পেশায় পরিণত হয়েছে ফেনী ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী নজরুল ইসলাম অয়নের। তার এমন সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে বিভিন্ন জেলার কলেজ ও ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া বেশ কয়েকজন তরুণ বিষধর সাপসহ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সাহসী ও উৎসাহী হয়ে উঠছেন।
এ পর্যন্ত বিষধর শঙ্খিনী, রাসেলস ভাইপার, কোবরা (গোখরো), কাল নাগিনী, দাড়াশসহ ১০ প্রকারের সাড়ে ৭শ’ সাপ উদ্ধার করে অভয়ারণ্যে অবমুক্ত করেছেন বলে বাসসকে জানিয়েছেন তরুণ অয়ন।
বর্তমানে এসব নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। তার সংগঠন দেশের প্রায় ৬০টি জেলায় রেস্কিউয়ারদের সমন্বয়ে কাজ করছে। সর্পদংশন প্রতিরোধ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনার স্বীকৃতি হিসেবে সংগঠনটি অর্জন করেছে জাতীয় পুরস্কার।
নজরুল ইসলাম অয়ন ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার জি.এম. হাট ইউনিয়নের পশ্চিম বশিকপুর গ্রামের মরহুম মাহবুবুল আলম ও পারভীন আক্তারের একমাত্র সন্তান। তিনি ফেনী ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্যের শেষ বর্ষের ছাত্র। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী আর বিশেষ করে সাপের প্রতি রয়েছে তার গভীর আগ্রহ।
সারাদেশে রেস্কিউ কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি, ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও নিজস্ব অর্থায়নে ফেনী ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেন তিনি। এ পর্যন্ত তিনি নিজে ৩ হাজার ৫শ’র অধিক বন্যপ্রাণী এবং ৭৫০ এর অধিক সাপ উদ্ধার করে নিরাপদে অবমুক্ত করেছেন।
বন্যপ্রাণী উদ্ধারের পাশাপাশি, তিনি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক সেমিনার আয়োজন ও পরিচালনা করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাপ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী সম্পর্কে সঠিক ও বৈজ্ঞানিক ধারণা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
অয়নের সঙ্গে আলাপকালে জানান, যেখানে সাপ দেখলেই মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন, সেখানে বিভিন্ন প্রকার বিষধর সাপের সঙ্গে তার নিত্য বসবাস। ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামসহ দেশের যেকোনো স্থানে লোকালয়ে সাপ ঢুকে পড়েছে, এমন খবর কেউ দিলেই ছুটে যান তিনি। যথাযথ পূর্বের প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ কৌশলে পরম মমতায় প্রাণীটিকে উদ্ধার করে মানুষের বসতি থেকে সরিয়ে উপযুক্ত প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করেন।
সাপ উদ্ধারকারী টিমের সাহসী সদস্যরা জনসাধারণকে বোঝাতে চেষ্টা করছেন যে, ওঝা দিয়ে বিষ নামানো বা সাপে কামড়স্থানে বেঁধে মানুষকে বাঁচানো অসম্ভব, এটা সামাজিক কুসংস্কার। সাপে কাটা মানুষকে দ্রুততম সময়ে চিকিৎসালয় পৌঁছানো গেলে বাঁচানো সম্ভব।
অয়ন কোনো ওঝা নন, সাপুড়েও নন। সাপ নিয়ে কোনো ব্যবসাও করেন না। প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই প্রায় একযুগ ধরে নিরলসভাবে এ কাজ করে চলেছেন।
তিনি আরও জানান, বন বিড়াল, চিতাবিড়াল, গন্ধগোকুল, শঙ্খচিল, ভুবন চিল মঙ্গলময়ন, শালিকসহ ৩ হাজারেরও বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন করেছেন। শুধু উদ্ধার নয়, আহত প্রাণীদের সুস্থ করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
তিনি জানান, ইঁদুরসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণী নিয়ন্ত্রণ করে কৃষিকে রক্ষা করছেন। সাপের বিষ থেকেই তৈরি হয় জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিভেনম ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ।
অয়ন বলেন, ছোটবেলা থেকেই কোনো প্রাণীর প্রতি নির্যাতন বা আক্রমণ আমার সহ্য হতো না। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় একবার একটি সাপ ধরে বাসায় নিয়ে আসি। মা-বাবা অনেক বকা দিয়েছেন। সেই থেকেই বন্যপ্রাণীর প্রতি আমার ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। আজও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।
প্রকৃতি ও প্রাণির প্রতি ভালোবাসা ও দু:সাহসিকতার কারণে তিনি অনেক আগেই ডাক পেয়েছেন এশিয়ার বৃহত্তম সাপ ও বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী সংগঠন ওয়ার্ল্ড লাইফ এন্ড স্নেক রেসকিউ টিম ইন বাংলাদেশ থেকে।
সংগঠনটির একজন রেস্কিউয়ার হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তিনি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও ফিল্ড ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করছেন।
ফেনী ইউনিভার্সিটির ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান সাদিয়া তাবাসসুম নোশিন বাসসকে বলেন, নজরুল ইসলামের বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তার সাহস, দায়িত্ববোধ এবং প্রাণীদের প্রতি আন্তরিকতা একজন শিক্ষক হিসেবে আমাকে মুগ্ধ করে।
নিজস্ব উদ্যোগ ও অর্থায়নে মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাওয়ার এ মানসিকতা নি:সন্দেহে গর্ব করার মতো এবং আমি তার এই মহৎ প্রচেষ্টাকে আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাই।
সামাজিক বন বিভাগ ফেনীর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন বাসসকে বলেন, নজরুল ইসলাম ওয়াইল্ড লাইফ ভলেন্টিয়ার রেসকিউ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বনবিভাগের সাথে কাজ করে আসছেন। এ বিষয়ে বন বিভাগের বিভিন্ন উদ্যোগের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে কাজ করছেন।
বিশেষ করে নজরুল ইসলাম ফেনী অঞ্চলে অনেক মানুষের আতঙ্ক যেমন দূর করেছেন, তেমনি পরিবেশের একটি উপাদান বিভিন্ন প্রজাতির সাপকে বিলীনের হাত থেকে রক্ষা করে আসছেন। তিনি পরিবেশের অপরিহার্য উপাদান সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বলে এ বন কর্মকর্তা মনে করেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন