প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চার দিনের টানা ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া এবং নবগঠিত মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলার ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হয়ে গেছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় দুই উপজেলার দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
মাতামুহুরী এবং পেকুয়া উপজেলার বেশ কিছু বেড়িবাঁধ ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এর ফলে নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি সরে গিয়ে চকরিয়া উপজেলায় বরইতলী ইউনিয়নে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজনের নাম রুমি আক্তার (১৫)। সে বরইতলী ইউনিয়নের মোহছেনিয়া কাটা গ্রামের মোহাম্মদ কাজলের কন্যা এবং বরইতলী দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী।
অন্য শিশু মোহাম্মদ তৌসিফ (১০) আবদুল মজিদের পুত্র এবং স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী। নিহতরা আপন চাচাতো-জেঠাতো ভাই-বোন। বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জামান বলেছেন, "একদিকে ভয়াবহ বন্যা, অন্যদিকে পাহাড় ধ্বসের কারণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে লোকজনের মধ্যে। গত দুইদিন ধরে পানিতে তলিয়ে রয়েছে গ্রামগুলো। এই অবস্থায় পাহাড় ধসে দুইজন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।"
জানা গেছে, চকরিয়া উপজেলার বরইতলী, বমু বিলছড়ি, কাকারা, লক্ষ্যারচর, চিরিংগা, হারবাং এবং নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর, সাহারবিল ইউনিয়নের নিচু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
এদিকে, পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া, মগনামা, বারবাকিয়া, মেহেরনামা এবং পৌরসভা এলাকারও বন্যার পানিতে প্লাবিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, অনেক ফসলি জমি এবং চিংড়ির ঘেরও পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। টানা ভারী বর্ষণে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় দুই উপজেলার পাহাড়ি এলাকার পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরত পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশয়ে সরে যেতে প্রশাসন মাইকিং করছে।
চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা এডভোকেট মঈনুল আমিন বলেছেন, "চার দিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টি থামলেই মনে হয় পানি নামবে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। রাস্তাঘাটে পানির নিচে থাকায় চলাচল খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।" মাতামুহুরী উপজেলার সাহারবিল ইউনিয়নের কৃষক সৈয়দ আলম জানান, "আমনের বীজতলা ও সবজিক্ষ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফসলের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেছে।" চকরিয়া পৌরসভার রিকশাচালক শহিদুল ইসলাম বলেছেন, "বৃষ্টির কারণে যাত্রী কম। সারাদিন রিকশা চালিয়েও ঠিকমতো আয় হচ্ছে না। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।"
চকরিয়া পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মঈনউদ্দিন বলেছেন, "উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে মাতামুহুরী নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। পৌরসভার অধিকাংশ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। কেউ রান্নাবান্না করতে পারছে না। শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছে। আমি নিজেও পানিবন্দী হয়ে পড়েছি। এরপরও চেষ্টা করছি এলাকার বন্যা কবলিত মানুষদের সাহায্য করতে।" মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সোয়াইবুল ইসলাম সবুজ বলেছেন, "চার দিনের টানা বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদ সীমার উপরে রয়েছে।"
তিনি বলেছেন, "ইতোমধ্যে কোণাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী ও মরণঘোনা বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এতে লোকালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করছে। আমরা বন্যা কবলিত মানুষদের খোঁজ খবর নিচ্ছি।" চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীদ দেলোয়ার জানিয়েছেন, "টানা ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ে ঢলের পানিতে মাতামুহুরী নদীতে পানি বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে মাতামুহুরী নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। স্ব-স্ব ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের সজাগ দৃষ্টি রাখার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।"
তিনি আরও বলেছেন, "পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে। উজানের পানি যাতে দ্রুত ভাটির দিকে নেমে যেতে পারে সেজন্য উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর পানি নিষ্কাশনের লইস গেটগুলোর কপাট খুলে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সার্বিক পরিস্থিতি তদারকির জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, মাতামুহুরী নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত নদীর পানি বিপদসীমা ১১.৮০ মিটার অতিক্রম করে ১১.৯৪ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন